৩১ ডিসেম্বর, ২০০৯
বই-কথন (৩)
মুহম্মদ জাফর ইকবাল তার সায়েন্স ফিকশনের জন্যই সর্বাধিক পরিচিত। বাংলা ভাষায় সায়েন্স ফিকশন লিখতে গিয়েও তার মাঝে খুব বেশি জটিলতা তিনি আনেননি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সায়েন্স ফিকশনের শেষে মানবিক অনুভূতির বিজয় ঘোষণা করেছেন তিনি। তবে তার সায়েন্স ফিকশনে আমার সবচেয়ে ভাল লাগে, বলবার ভাষাটা। একরকম কৃত্রিমতা আর মানবিক অনুভূতি উভয়ই সমভাবে রেখেছেন তার ভাষায়। সম্ভবত প্রযুক্তি যে মানুষকে ছাড়িয়ে যাবে- এ ভাবনাটা তিনি আর সব বিজ্ঞানীদের মত প্রত্যাশা করেননি। লেখাতেও তা-ই সুস্পষ্ট।
আমি তাঁর সায়েন্স ফিকশনগুলো পড়েছি স্রেফ এ বছর। আলাদা আলাদা করে কিনলে বেশি পড়া যাবে না, তাই চার সমগ্রে প্রত্যেকটাতে আটটা করে তার সবগুলো সায়েন্স ফিকশনই পড়া হয়েছে, অবশ্যই সাম্প্রতিক কিছু বাদ দিয়ে। লেখকের প্রথম বই “কপোট্রনিক সুখ-দুঃখ”। অনেকগুলো ছোট ছোট গল্প নিয়ে বইটি। আত্মজৈবনিক বই “রঙিন চশমা” এ তিনি এই বইয়ের পেছনের কাহিনী লিখেছেন। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় এই বইয়ের প্রথম গল্পটি প্রকাশের পর এক পাঠক গল্পটিকে রাশিয়ান সায়েন্স ফিকশন “আইভা”র অনুকরণ বলে অভিযোগ করলে তিনি একের পর এক কপোট্রনিক শিরোনামে গল্প লিখে যেতে থাকেন। সবশেষে মুক্তধারা থেকে প্রকাশ হয় “কপোট্রনিক সুখ-দুঃখ”।
পুরো বইটাই রোবোটিক ধরনের লেগেছে। আগেই বলেছি, তার বলবার ভাষায় কৃত্রিমতা আর মানবিক অনুভূতি উভয়ের সংমিশ্রণ রয়েছে। উত্তম পুরুষে লেখা চরিত্রে একে একে মানবিক অনুভূতিসম্পন্ন রোবট নির্মাণ, সেই রোবটের তার স্ত্রীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়া, আর সেই থেকে রোবটের প্রতি তার ঘৃণার উতপত্তি। তবুও জীবনের পথপরিক্রমায় তাকে রোবটের সাহচর্যেই বেঁচে থাকতে হয়। এমনকি, তার রোড এক্সিডেণ্টে মুমূর্ষু স্ত্রীকে বাঁচাতে তার ক্ষতিগ্রস্ত মস্তিষ্কের বদলে তিনি কৃত্রিম মস্তিষ্ক, যাকে তিনি কপোট্রন নামে অভিহিত করেছেন, তা স্থাপন করেন। পরবর্তীতে তার স্ত্রী বুলার সাথে তার দ্বন্দ্ব, সময় পরিভ্রমণ মেশিন, রোবটদের স্বাধীনতা লাভের আকাঙ্ক্ষা সবমিলিয়ে কাহিনী এগিয়ে যেতে থাকে। সবশেষে গিয়ে আবিষ্কার করি, এটা একটা ডায়েরী, এর পাঠক একটি রোবট। খানিক সময়ের জন্য বিস্মিত আর নীরব থাকবার সুযোগ করে দেন লেখক। শেষের এই অনুভূতিটা অসাধারণ।
মুহম্মদ জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশনে মানবিক অনুভূতি মাঝে মাঝে সায়েন্স ফিকশনের মূল উপজীব্যকে ছাড়িয়ে গেছে। রোবটের বিপক্ষে মানুষের জয়কে দেখাতে গিয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে অনুভূতির আধিক্যই প্রাধান্য পেয়েছে। সায়েন্স ফিকশনগুলো নির্দিষ্ট করে কিশোরদের জন্য লেখা হলে সম্ভবত “রোমান্স” এর মাত্রাধিক ব্যবহার এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। এ নিয়ে তিনি নিজেই কিছু তিক্ত প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন বলে জানি। বিশেষ করে “নিঃসঙ্গ গ্রহচারী” আগাগোড়াই রোমাণ্টিক। চমতকার একটা প্লট ছিল, কিন্তু মাত্রাধিক অনুভূতি সায়েন্স ফিকশনের যোগ্যতা পূরণ করতে অনেকাংশেই ব্যর্থ বলে আমার মতামত। এরকম আরও কিছু, “ক্রোমিয়াম অরণ্য”, “ত্রিনিত্রি রাশিমালা”, “একজন অতিমানবী”, “ফোবিয়ানের যাত্রী”, “ফিনিক্স”, “অবনীল”। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, তাঁর প্রায় সব বইতেই অনুভূতি খুব বেশি প্রকট। তবে “ক্রোমিয়াম অরণ্য”, “ত্রিনিত্রি রাশিমালা”, “একজন অতিমানবী”, “ফোবিয়ানের যাত্রী”, “ফিনিক্স”, “অবনীল”- এগুলো “নিঃসঙ্গ গ্রহচারী” এর মত এতটা প্রবল নয়। তাই আমাদের মত সাধারণ পাঠকদের জন্য মোটামুটি সুখপাঠ্যই হয়ে উঠেছে। সম্ভবত সাধারণ পাঠকদের উদ্দেশ্য করেই তার এ লেখাগুলো। সাধারণ পাঠক, সাধারণ মানুষ, তার মাঝে খানিকটা বিজ্ঞান এনে সায়েন্স ফিকশনের অন্যরকম একটা ধারা সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তিনি। বাংলা ভাষায় নতুন একটা ধারা সৃষ্টির সাহসী প্রচেষ্টার জন্য অবশ্যই তিনি অভিনন্দনপ্রাপ্তির যোগ্য।
কিছু সায়েন্স ফিকশন আমারও বেশ প্রিয়। উল্লেখ করা যায় “অবনীল”, “নায়ীরা”,“কপোট্রনিক সুখ-দুঃখ” আর “টানেল” এর কথা। অবনীল নিয়ে লেখকের ভাষ্য, তিনি খুব বেশি সমালোচনা পাননি। অবনীল এর আকার অন্যান্য সায়েন্স ফিকশনের চেয়ে ছোট। এখানেও মানবিক অনুভূতির উপস্থিতি রয়েছে, কিন্তু বর্ণনার ভাষা আর কাহিনী সেটাকে ছাপিয়ে গেছে। অবনীল এর মূল চরিত্র ‘রিরা’, একজন নতুন মহাকাশচারী। ‘’নীলমানব” নামক এক ভিন্ন ধরনের মানুষ, যাদেরকে সাধারণ মানুষ অপরাধী বলে গণ্য করত, তাদের একটি স্পেসশীপে করে নিয়ে যাবার সময় সংঘটিত ছোটখাট একটা যুদ্ধে সবাই মারা যায়। বেঁচে থাকে শুধু রিরা আর একজন নীলমানব, কুশান। ক্রমান্বয়ে বেঁচে থাকবার তাগিদে তারা বন্ধু হয়ে দাঁড়ায় এবং সবশেষে অজানা গ্রহের কষ্টকর জীবন থেকে মুক্তি পাবার ক্ষণে কুশান রিরা’কে উদ্ধার করতে আসার মানুষদের হাতে প্রাণ হারায়। নীলমানব আর সাধারণ মানুষদের মধ্যেকার ব্যবধান ঘুচে যায়।
এ গল্পটা কেন ভাল লেগেছে নিশ্চিত নই। অন্যান্য সায়েন্স ফিকশনের চেয়ে ভিন্নধর্মী চরিত্র, একই চরিত্রকে ঘিরে ক্রম-আবর্তনই সম্ভবত এই ভালোলাগার কারণ। “কপোট্রনিক সুখ-দুঃখ” এর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত আগেই করেছি, পুনরায় করে আর বিরক্তির উদ্রেক ঘটাতে চাইছি না।
“নায়ীরা”। একজন খ্যাতিমান বিজ্ঞানী নীরা ত্রাতিনা আর তার সহকর্মী রিশানকে দিয়ে শুরু হয়েছে গল্প। ঘটনাক্রমে রিশান নীরাকে বাঁচাতে প্রাণত্যাগ করে। নীরা বেঁচে যায়, কিন্তু আশংকাজনক অবস্থায় থাকায় তাকে ক্লোন করা হয়। সেই উনিশজন ক্লোনের মাঝে একজন, নায়ীরা। দুটো শহরের মাঝে বিভ্রান্তির অবসান ঘটাতে প্রযুক্তিতে উন্নত মানুষেরা অনুন্নত মানুষদের ধ্বংস করবার জন্য নায়ীরাকে ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু শেষ পর্যায়ে এসে নায়ীরা বেঁচে যায়, আর আবিষ্কার করে এই অনুন্নত মানুষেরা আসলে উন্নত মানুষদেরই একটি পরীক্ষণ। তাদের বাঁচাতে সে আগ্রহী হয়ে পড়ে, আর জানতে পারে নীরা ত্রাতিনার কথা। নায়ীরার দেহে ঢুকিয়ে দেয়া ভাইরাস তাকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করায়, কিন্তু নীরার মধ্যে মাতৃত্ববোধ জেগে ওঠে। নায়ীরার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বদলে দেয়া হয় নীরার সাথে। বেঁচে যায় নায়ীরা। সম্ভবত নায়ীরার সারল্যই আমার ভালো লাগার কারণ।
সবশেষে “টানেল”। আকারে খুবই ছোট একটা গল্প। মূল চরিত্র বীপা আর রিশান। বীপা সাধারণ এক তরুণী, রিশান বড় বিজ্ঞানী। বীপা সাধারণ মানুষ, সাধারণ তার অনুভূতি, বাইরের কোন কিছুই তাকে টানে না, রিশানকে কেন্দ্র করেই তার বেঁচে থাকা। রিশান ব্যস্ত সময় নিয়ে গবেষণায়। এক পরীক্ষায় রিশান ঘটনাক্রমে সময়ের অনেক আগে চলে যায়। আর আবিষ্কার করে বীপা তখন আর তার নয়। বীপা ক্লান্তিকর কণ্ঠে জানায়, রিশান হয়ত বড় বিজ্ঞানী, তার আবিষ্কারগুলো বড়; কিন্তু বীপা সাধারণ মানুষ, সাধারণ তার অনুভূতি। বীপা তাই তার নয়। শেষের কথাগুলো চমকপ্রদ। বীপা জিজ্ঞেস করতে চাইল, “কোথায় যাবে তুমি?” কিন্তু পারল না। বারো বছর পর তাদের কারোর ওপর কারোর কোন অধিকার নেই। লেখকের বলার ভঙ্গিমা আর সমাপ্তিটাই আমাকে টেনেছে বেশি। এছাড়া আরও কিছু পথে এটাকে ভেঙে বলা যায়। পরে এক সময় ব্যাখ্যা করা যাবে বলে আশা রাখি।
এছাড়া জাফর ইকবালের আরও কিছু বই রয়েছে। আত্মজৈবনিক বই “রঙিন চশমা”, “তোমাদের প্রশ্ন আমার উত্তর” অন্যতম। এসব মূলত তার লেখালেখির বা বইয়ের পেছনের কথা। সুখপাঠ্য লেখা, আলাপচারিতার ভঙ্গিটা চমৎকার।
এখানেই শেষ মুহম্মদ জাফর ইকবাল পর্ব।
বই-কথন (২)
শান্তা পরিবার। শান্তা নামের এক বালিকা, শৈশব থেকেই কষ্ট পেতে পেতে জীবনকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করবার পরিকল্পনা নিয়ে ঘর বাঁধে। শাঁওলী, বন্যা, ঝুমুর, সাগর, সুমন- এই পঞ্চবাচ্চাকাচ্চা নিয়ে তার দিন কেটে যেতে থাকে। একসময় রোড এক্সিডেন্টে মারা যায়। আর ছেলেমেয়েদের কাছে একটা শিক্ষা রেখে যায়, নিজের জন্য বাঁচার কোন অর্থ নেই, বাঁচতে হয় অন্যের জন্য। সদ্য মা-হারা ছেলেমেয়েদের শাঁওলী পরম ভালবাসা দিয়ে আঁকড়ে ধরে রেখে পরিবারটাকে টেনে নিতে থাকে। নানা হাসি-কান্না নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে তার পরিবার। তবে শেষ দৃশ্যে শান্তার মৃত্যুবার্ষিকীর ক’দিন আগে ছেলেমেয়েরা কল্পনা করে, শান্তা ফিরে এসেছে। এই ফিরে আসা পর্যন্তই গল্পের শেষ। লেখক এই ফেরার মায়াজালটাই ধরে রেখেছেন। তার কিশোর পাঠকদের কাছে জানাতে চাননি যে, এটা ছিল কল্পনা। শান্তা ফেরেনি। এমনকি আমি সেই শৈশবে খানিকটা দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলাম যে, শান্তা কি আসলেই ফিরে এসেছে? মৃত্যুর করাল গ্রাস কি তাকে তার ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারেনি? এমনই একটা চিত্র অংকন করেছেন জাফর ইকবাল, তার অসাধারণ কল্পনার ভাষা দিয়ে। সবকিছুর মিশেল দিয়ে লেখা বইটি। ভালো লাগা প্রথম বই।
শান্তা পরিবারই পরবর্তীতে আমার মুহম্মদ জাফর ইকবালের অন্যান্য বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। যদিও তিনি তার সায়েন্স ফিকশনের জন্যই বেশি পরিচিত; কিন্তু আমি শুরু করেছিলাম তার কিশোর উপন্যাসগুলো দিয়ে। শান্তা পরিবারের পর অন্যান্য বইয়ের মধ্যে যদি বিশেষভাবে কিছু বইয়ের কথা উল্লেখ করতে হয়, তবে সেটা “কিছু” শব্দের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না, তালিকাটা বেশ লম্বা। “নিতু ও তার বন্ধুরা”, “তপু”, “আমার বন্ধু রাশেদ”, “বুবুনের বাবা”, “বকুলাপ্পু”, “দস্যি ক’জন”, “দুষ্টু ছেলের দল”, “কাজলের দিনরাত্রি”- এরকম কয়েকটা বই।
খেয়াল করলে দেখা যাবে, এগুলোর প্রত্যেকটার চরিত্রগুলোর মাঝেই কোন না কোন দুঃখ লুকিয়ে আছে। বেশিরভাগেরই মা কিংবা বাবা নেই। আর সেই সমস্যাকে কেন্দ্র করে তারা এগিয়ে যেতে থাকে। যেমন নিতু, সৎমায়ের ইচ্ছেতে হোস্টেলে পাঠানো হয় তাকে। হাসিমুখেই সে মেনে নেয়। সেখানে এরকমই অন্যান্য বন্ধুদের নিয়ে স্কুলের হেডমিস্ট্রেসের অপকর্মের বিরুদ্ধে কাজ করতে করতে সবশেষে মাতৃসম একজন শিক্ষককে খুঁজে পায়। এটা নিয়ে খুব সম্ভব একটা নাটকও হয়েছিল। একুশেতে প্রচার হয়েছিল সম্ভবত। অতটা মনে পড়ছে না এখন।
তপু। সম্ভবত লেখক এখানে জীবনের জটিলতা আর কষ্টের অন্যরকম একটা জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে একটু বেশিই নিষ্ঠুরতা করে ফেলেছেন। “আমার বন্ধু রাশেদ” লেখকের অন্যতম আবেগময় লেখা, যেটা অনেকেরই অশ্রুসিক্ত হবার কথা শোনা গেলেও, আমি খুব সাধারণভাবে সেটা পড়ে শেষ করেছিলাম। বুঝিনি তাই নয়, কিন্তু আমার চোখ ভেজেনি। অন্যদিকে তপু এমন একটা চরিত্র, যা সম্ভবত আমরা বাস্তব জীবনে দেখব না। তপুর ক্রিকেট ব্যাট আনতে গিয়ে তার বাবা রোড এক্সিডেন্টে মারা যায়, কিন্তু ভাগ্যক্রমে তপু বেঁচে যায়। এটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। তার মা তাকে তার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন, এবং অন্য দুই ছেলেমেয়ে থেকে পৃথক করে চরম অবহেলা করতে থাকেন। সে বাড়ির গৃহকর্মীর দেখাশোনায় বড় হতে থাকে। তার সম্ভাবনাগুলো নির্বাপিত হয়ে যায় ক্রমান্বয়ে। পরিবারের সম্পূর্ণ বাইরে বেড়ে ওঠে সে। পরবর্তীতে তারই এক নতুন সহপাঠীর সহায়তায় সে তার প্রতিভাগুলোকে আবার জাগিয়ে তোলে, তার নির্বাপিত সত্তা জেগে ওঠে। শেষ দৃশ্যে, তার শয্যাশায়ী মা তাকে বুকে চেপে ধরেই মারা যান। যে মা, এতদিন তার প্রতি চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়ে এসেছেন, তাকে বুকে চেপে ধরেই তিনি মারা যান। শেষ দৃশ্যটা খুব বেশি আবেগী হয়ে উঠেছিল সেখানে, কিঞ্চিত অশ্রুবর্ষণ করতে হয়েছিল আমায়।
বুবুনের বাবা, দস্যি কজন, বকুলাপ্পু- মোটামুটি একই শ্রেণীর বই। কৈশোরের নির্মল আনন্দ পাওয়া যাবে, জীবনের জটিলতার খানিক সন্ধানও পাওয়া যাবে, তবে “তপু” বা “শান্তা পরিবার” এর মত এর জটিলতা এতটা গভীর নয়। তাই আলাদা করে উল্লেখ করছি না। তবে “কাজলের দিনরাত্রি” অন্য সব বই থেকে খানিক ভিন্ন মনে হয়েছে আমার। উচ্চবিত্ত বাবার অর্থসম্পদের মোহ ছেড়ে কাজলের মা আর কাজল আলাদাভাবে থাকতে শুরু করে। তাদের এই “ভাঙা পরিবার” আর বাবা শিল্পপতি আলতাফ নবীর পুত্র পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসবার প্রচেষ্টা, মধ্যবিত্তের সরল জীবনে উচ্চবিত্ত পরিবারের কাজলের মিশে যাবার প্রচেষ্টা সব মিলিয়ে চমৎকার গল্প। সারমর্মটা লেখক বেশ সরলভাবেই কিশোর পাঠকদের কাছে তুলে ধরেছেন। “অর্থবিত্ত দিয়ে সবকিছু হয়না।“
সংক্ষেপে এই হল মুহম্মদ জাফর ইকবালের কিশোর উপন্যাসগুলোর সম্পর্কে আমার ভাবনা।
৩০ ডিসেম্বর, ২০০৯
বই-কথন
“My days among the Dead are past
Around me I behold;
Where’re these casual eyes are cast,
The mighty minds of old:
My never failing friends are the;
With whom I converse day by day.
....My thoughts are with the Dead, with them
I live in long-past years,
Their virtues love, their faults condemn,
Partake their hopes and fears,
And from their lessns seek and find
Instruction with an humble mind.
-Robert Sadi"
বই। কবিতাটা বই প্রসঙ্গেই। আজকালকার যন্ত্রজীবনে একটা জনপ্রিয় বিতর্ক প্রযুক্তি বইয়ের ব্যবহার কমিয়ে দিচ্ছে। পক্ষে বিপক্ষে কে কি বলবেন, জানি না। তবে আমি খেয়াল করেছি, প্রযুক্তির সাথে আমার নিত্যদিনকার জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকলেও বইটা ছাড়া কেন যেন চলে না আমার।
প্রিয়ত্বের অনুভূতিটা সবসময়েই আপেক্ষিক। বইয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য বলেই আমার ধারণা। এই যেমন, কবিতার প্রতি আমার আগ্রহ নেই। কবিতার বইও তাই আগ্রহের বাইরে। কেউ হয়ত লেখককেন্দ্রিকভাবে বই পড়ে, কেউ আগ্রহের বিষয়, আবার কেউ জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে। আমি বই পড়ি মূলত লেখককেন্দ্রিকভাবে। একেকজন লেখক, একেকটি লিখবার ভঙ্গি, দর্শনের পার্থক্য, শব্দ ব্যবহার পারঙ্গমতা- একেকজনের একেকরকম। তবে এখন পর্যন্ত ভাল লেখকের সবগুলো গুণ আমি ঠিকঠাক খুঁজে পাইনি। এর কারণ হয়ত, এখনও বইয়ের জগতে এতটা ভেতরে পৌঁছতে পারিনি। যতটুকু পেরেছি, তা থেকেই ভাল লাগা কিছু বই বা গল্প নিয়ে এই কথকতা।
অক্ষরজ্ঞান লাভের পর আমার প্রথম পড়া বইগুলোর মধ্যে ছিল ডিজনির ফেয়ারি টেলসগুলো। মূলত পড়ার গতি আর উচ্চারণ দ্রুত করবার জন্যই সেসব বই পড়া। এটা নিয়ে বিস্তারিত এগোব না, কেননা, অন্য একটা পোস্টে সেটা উল্লেখ আছে।
অনেকদিন পর্যন্ত ডিজনির এসব বই নিয়েই মেতে ছিলাম। উল্লেখ্য, আমাদের পরিবারে বই পড়ার চল খুব নেই। কাজের ব্যস্ততায় বাবা-মা দুজনেই এসব শখ বিসর্জন দিয়েছে। তবে বই পড়াকে নিরুতসাহিত করেনি কখনই। অথবা বই বাছাই করে দেয়া, এটা পড়া চলবে না, ওটা পড়া চলবে না- এমন শেকলও পায়ে পড়েনি কখনও। নিউমার্কেটে নিত্যই যাতায়াত ছিল আমাদের। পাপা নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানগুলোর একদম কর্ণারে আলীগড় লাইব্রেরিতে তার অফিসের কাজের নানা বই দেখতে থাকত, আর আমি তারই একপাশে রাখা মোটা মোটা বইগুলো দেখতে থাকতাম। শেলফটাকে মনে হত প্রায় আকাশের মত উঁচু, আর তাতে রাখা বইগুলো একেকটা যেন বিস্ময়ের ভাণ্ডার। আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক কিছুতেই ভেবে পেত না, কি আছে এতে, এত কি কথা লেখা এতে যে বইগুলো এরকম বিশালাকার ধারণ করেছে!
এরকম অনেকদিন যেতে থাকে। আর আমার প্রায় ডিজনির সব বই-ই পড়া হয়ে যেতে থাকে। শেষমেষ প্রথম হাতে অন্যরকম একটা বই এলো। জাফর ইকবালের “শান্তা পরিবার”। এই-ই আমার প্রথম বই, প্রথম অদেখা জগত।
(চলবে)
মেয়েটা..
চোখে চশমা লাগিয়ে কাগজের ওপর খসখস শব্দে লিখে যাচ্ছি। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি। কিছু খেয়াল নেই। হঠাৎ গুড়গুড় শব্দে কোথায় যেন বাজ পড়লো। অবাক ব্যাপার,আমি চমকে উঠলাম না। যেমন লিখছিলাম শুধু হাতের কলমটা থমকে গেল। ক্লান্ত একটা নিশ্বাস ফেলে কলমটা হাত থেকে সরালাম। ৩ ঘণ্টা ধরে নাকের ওপর চেপে বসা চশমাটা খুলে ধীরে ধীরে উঠে দাড়ালাম। জানালাটা বন্ধ ছিল । ভীষণ বৃষ্টি পড়ছে। তবুও হাত বাড়িয়ে খুলে দিলাম। এক পশলা বৃষ্টি এসে আমায় ভিজিয়ে দিয়ে গেল। আহ! কতদিন এমন বৃষ্টি ছুঁই না। কিংবা আরো সহজ করে বললে বৃষ্টি আমায় ছোঁয় না। বাঁধা চুলগুলো খুলে দিলাম। মিষ্টি একটা ভেজা মাটির ঘ্রাণ আসছে বাইরে থেকে। ঘরের ঝলমলে আলো নিভিয়ে দাঁড়ালাম আবার জানালার পাশে।
চোখ বন্ধ করে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম কে জানে। আবার কড়কড় শব্দে বাজ পড়লো। কেউ যেন আমায় ভেতর থেকে বললো,"এই মেয়ে, চোখ বন্ধ করে দাড়িয়ে আছিস যে, বাইরে তাকা!" ভেতরের এই মানুষটা আমায় বড্ড জ্বালায়, তবুও কিছু বলি না। এই তো একজন যে আমায় খুব ভালোভাবে বোঝে, আমার কথাগুলো শোনে, আমায় বড্ড ভালোবাসে।
আনমনে এগুলো ভাবতে ভাবতেই আরো জোরে বৃষ্টি নামলো। ভাবছিলাম জানালাটা আটকে দেবো। হঠাৎ চারদিক আলো এক চিলতে বিদ্যুৎ চমকে উঠলো। ব্যস, সাথে সাথে লোডশেডিং। কি ভেবে আর মোমবাতি জ্বালালাম না। জানালার পাশে দাড়িয়ে বাইরে সিক্ত প্রকৃতি দেখছিলাম।
হঠাৎ আবছা একটা ছায়া দেখতে পেলাম যেন। একটা মেয়ে, সাদা রংয়ের একটা পোশাক পরা। খুব ধীরে ধীরে হাঁটছে। আমি অবাক চোখে তাকিয়ে আছি। মেয়েটার কি মাথা খারাপ! এই ঝুম বৃষ্টিতে বাইরে বেরিয়েছে! ক্ষণে ক্ষণে বাজ পড়ছে, হঠাৎ যদি কিছু একটা...। আর ভাবতে পারলাম না। দরজা খুলে বাইরে বেরোলাম, হাতে একটা ছাতা নিয়ে।
বৃষ্টিটা আরো বাড়লো। মেয়েটা কিন্তু হেঁটেই যাচ্ছে। এত শব্দে কিভাবে আমার ডাক শুনবে। তাই যেভাবে পারি পেছন পেছন দৌড়ানোর চেষ্টা করলাম। একটু কাছে যেতেই ডাকলাম, "এই মেয়ে,এই,শোনো, এই মেয়ে..." মেয়েটা কি আজব! আমার কথা যেন শুনতেই পাচ্ছে না। শুধু সামনে হেঁটে যাচ্ছে। হঠাৎ কি ভেবে মেয়েটাকে অনুসরণ করতে লাগলাম। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। আরো বাড়ছে। আমি মেয়েটার পেছন পেছন হেঁটে যাচ্ছি। তার কোনো খেয়াল নেই। সে খালি মাঠটার মধ্য দিয়ে খুব ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে। হঠাৎ নিচে তাকাতেই দেখি লাল রঙা কিছু ছাপ। নিচু হয়ে দেখি , ঘাসের ওপর রক্ত । কোথা থেকে এলো!? বিস্ফারিত চোখে দেখি মেয়েটা যেদিকে হেঁটে যাচ্ছে, ঠিক সেদিকেই এমন রক্তের ছাপ রেখে যাচ্ছে। কি করব বুঝে পেলাম না।
কিছুক্ষণ এমনি করে রক্তের ছাপটার কথা ভাবছিলাম। আবার দূরে কোথায় যেন কড়কড় করে বাজ পড়লো। আমি চমকে উদভ্রান্ত দৃষ্টি দিয়ে মেয়েটার দিকে তাকালাম। মনে হল যেন মেয়েটার ওপর দিয়েই বাজের আলো খেলে গেল। তারপর,তারপর কোথায় মেয়েটা!? আবার ছুটলাম, মেয়েটা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক সেখানে। কই? সেখানে তো সে নেই। কড়কড় শব্দে বাজ পড়লো দূরে কোথাও, আরো জোরে বৃষ্টি নামলো।
আমাকে না পেয়ে মা বাইরে ছুটে এসেছিল ছাতা নিয়ে । আমি নাকি মাঠের মাঝখানে পড়েছিলাম। ঝুমিয়ে বৃষ্টি পড়ছিল আমার ওপর। কোনোমতে আমায় ঘরে এনে শুইয়ে দিয়েছিল। তিনদিন জ্বরে অচেতন হয়ে ছিলাম। মাঝে মাঝে চিৎকার করে উঠেছিলাম ঘুমের ঘোরে ,"এই মেয়ে, এই,শোনো, কোথায় তুমি, এই মেয়ে...."
তারপর আর কোনোদিন বৃষ্টিতে ভিজিনি। বৃষ্টির সময় জানালা খুলিনি কখনও, বন্ধ করে রেখেছি। বাজ পড়লে কানের ওপর হাত চাপা দিয়ে রেখেছি। এখনও মনে পড়ে, বৃষ্টিতে একটা মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে.....ক্ষণে ক্ষণে বাজ পড়ছে...ঝুমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে.... আর ঘাসের ওপর রক্তমাখা পায়ের ছাপ...
২৫ ডিসেম্বর, ২০০৯
রোদ্দুর..(শেষের গল্প)
মনের ভেতর অপরাধবোধের ছোটখাট একটা ঝড় বয়ে যেতে থাকে, নিত্যদিনের মত। এই দিন কয়েক ধরেই আমি রোদ্দুরের অপেক্ষায় থাকি, আর প্রতিদিনই ভিন্ন ভিন্ন কণ্ঠের আর্তচিৎকার রোদ্দুরের জন্য পরম আকাঙ্ক্ষাগুলোকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতে থাকে। আমি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকি, আর অপেক্ষা করি মনের এই অপরাধবোধের বিলুপ্তির জন্য। আর প্রতিদিনকার মতই, একটা নিয়মবাঁধা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সিঁড়ি ধরে নেমে আসি, সেই আর্তচিৎকারের উৎস সন্ধানে।
মেঘদুয়ার ভেঙে সোনা রোদ সামনের সবুজ বাগানটাকে উদ্ভাসিত করে দিচ্ছে। দেখে মনের এতক্ষণের অপরাধবোধ সরে গিয়ে একরকম ভালোলাগা স্থান করে নিতে থাকে। কিছুক্ষণ সেই সোনা রোদে ‘সিক্ত’ ঘাস আর লতাগুলোর ঝলমলে রঙ এর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে যখন মনে পড়ে আমি কিসের জন্য নিচে নেমে এসেছি,তখনই এই ক্ষণিকের ভালোলাগাটা উবে যায়। এই আর্তচিৎকারের উৎসটা আমার জানা এবং আমি সেদিকেই পা বাড়াতে থাকি।
মিনিটখানেকের পথ। কিন্তু বিক্ষিপ্ত সব ভাবনা আমার চলার গতিকে স্থির করে দেয় প্রতিবারই। চিৎকারের উৎস আর কারণটা একেবারেই আনন্দদায়ক বা কৌতূহলোদ্দীপক নয়, কিন্তু আমি প্রতিবারই একরকম অসুস্থ কৌতূহল নিয়ে নতুন শিকারটাকে দেখতে যাই।
যেখানে এই নির্মম ঘটনাটা ঘটে থাকে প্রতিদিন, তার ধারেকাছে গেলেই তার চিহ্ন পাওয়া যেতে থাকে। বাতাসে জংধরা লোহার নোনা গন্ধ, আর পথে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত জানিয়ে দিতে থাকে ভয়াবহ কিছু একটা ঘটে গেছে ওখানে। তবুও আমি এগিয়ে যেতে থাকি, ধীর, সামান্য ভীতসন্ত্রস্ত পায়ে। এতবার একই ঘটনা দেখবার পরেও আমার এই ভয়ার্ত ভাবটা কাটেনি। মোটামুটি নিঃশ্বাস বন্ধ করে এগিয়ে যেতে থাকি।
ক্রমান্বয়ে রক্তের ফোঁটাগুলো বিশালাকার হয়ে উঠতে থাকে আর আমি জানি, আরও একটু সামনে গেলে এটা একটা স্রোতের মত হয়ে দেখা দেবে। জংধরা লোনা গন্ধটা তীব্র হয়ে উঠতে থাকে, আর..
আমি শেষ পর্যন্ত সেখান থেকেই ফিরে যাই। আমি জানি, এটা একটা মানুষ, তার বিবেকের মৃত্যুচিৎকার আর তার রক্তক্ষরণের গল্প ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু আমি দেখবার সাহস করিনা। সময়ের পরিক্রমায় হয়ত আমার বিবেকেরও এরকম নির্মম রোদমাখা মৃত্যু ঘটবে, সেটা কি রকম হবে, আগে থেকে দেখবার সাহসটুকু আমার নেই। অসংখ্যবার এমনি করে অনেকগুলো বিবেকের মৃত্যু ঘটে। তার আর্তচিৎকার আদৌ আমাদের হৃদয়কে বিদীর্ণ কিংবা ভীত করে তুলতে পারে না। আমাদের যে সেই মৃত্যু দেখবার কিংবা উপলব্ধি করবার শক্তিটুকু নেই। তবুও আমি রোদ্দুরের অপেক্ষায় থাকি। মেঘভাঙা সোনা রোদের অপেক্ষায় থাকি। আমার প্রবল বিশ্বাস, সেই রোদ্দুর শুধু মানুষের বিবেকের মৃত্যুই নয়, নবজন্মও ঘটাতে পারবে…..
২৪ ডিসেম্বর, ২০০৯
রোদ্দুর..
বেলা প্রায় পড়ে এসেছে। দিন কয়েক ধরেই আকাশে মেঘের ভীষণ আনাগোনা। গুমোট আকাশ। এমন দিনগুলো আমার বরাবরই খুব খারাপ যায়, বিষণ্ণতা এসে মনের মাঝে ছায়া ফেলতে শুরু করে। আমি তখন কিছু একটা করতে করতে নিম্নস্বরে বলি, "ও মেঘমালা, একটু সরেই যাও না, ওই যে, তোমার পেছনে সুয্যি অপেক্ষায় আছে আমার..একটু সোনারোদ আসতে দাও গো মেঘমালা, একটু রৌদ্র আসতে দাও.." শৈশবে আকাশে মেঘ করলেই মা বলতেন এ কথা। আমি একরকম অদ্ভুত বিশ্বাস নিয়ে আকাশপানে চেয়ে থাকতাম, আর কিভাবে যেন দেখতে দেখতেই মেঘ কেটে যেত। আর এই যে, আমি, দিন কয়েক ধরে রোজ দুপুরেই ধীরেলয়ে বলে যাই কথাগুলো, কিচ্ছুই যেন হয়না। মেঘগুলো আরও যেন আমাকে বিদ্রূপ করতেই আমার বাড়ির ছাদে কিংবা জানালার কাছে এসে দাঁড়ায়।
হঠাতই যেন একটু একটু করে বিষণ্ণতার দেয়াল চুইয়ে পড়া জলকণাগুলো ঝরতে থাকে। আপ্রাণ চেষ্টায় জলকণাগুলোকে আটকে রাখতে রাখতে উঠে দাঁড়াই। জানালার ধারে আইভি লতার ধারে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে মেঘমালাগুলোকে আবার বলি, "ও মেঘমালা, একটু সরেই যাও না, ওই যে, তোমার পেছনে সুয্যি অপেক্ষায় আছে আমার..একটু সোনারোদ আসতে দাও গো মেঘমালা, একটু রৌদ্র আসতে দাও..” হাতের ওপর শীতল জলকণার স্পর্শ অনুভব করি হঠাত। সিক্ত আইভি লতার জল। কে জানে, হয়ত আইভি লতাও আজ মনে মনে একই কথা বলছে, “রৌদ্র আসতে দাও..”
মূহুর্তের নীরবতাটা দীর্ঘায়িত হতে পারত, আরও বেশি গভীর হতে পারত। যদি তীক্ষ্ণ কণ্ঠের আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করা চিৎকারটা না আসত। আমি যেন মেঘগুলোকেও কেঁপে উঠতে দেখি সেই চিৎকারে। আমার দিন কয়েকের অনুরোধে যে মেঘ সামান্যতম পরোয়া করেনি, সেই মেঘগুলোই যেন এই অজানা মানুষের চিৎকারে কেঁপে ওঠে, খানিকটা সরে যায়, রৌদ্র এসে স্থান করে নেয় সেই শূন্যস্থানে। আমার বেশ খুশি হয়ে ওঠার কথা। রৌদ্র যে আমার এই বিষণ্নতার অবসান ঘটাবে, কিন্তু মনের এক কোণে কোথায় যেন দীর্ঘদিন ধরে জমা করে রাখা একরাশ দীর্ঘশ্বাস বের করে দেয়। অমন রোদ্দুর তো আমি চাইনি। যে রোদ্দুর একজন মানুষের মরণের নিষ্ঠুর আগমনধ্বনি শোনায়, অমন রোদ্দুর তো আমি চাইনি। কেমন যেন স্বার্থপর হয়ে গেছি আমি। জানালার কাঁচ সরিয়ে আসা, আইভি লতা ছুঁয়ে আসা নরম রোদ্দুরের লোভে আমি কিভাবে ভুলে যাই যে, রোজ এই রোদ্দুরের দেখা পাবার অর্থ একজন মানুষের শেষ নিঃশ্বাস….
(চলবে)
১৫ ডিসেম্বর, ২০০৯
অনভিজ্ঞের ছবিকথন
ফটোগ্রাফার বলতে যা বোঝায় আমি তা নই। নিতান্ত সখের বশে ক্যামেরার শাটারের ওপর দিবারাত্রি কাজের মাঝে মাঝে আমার অত্যাচার চলতে থাকে। সেই ক্যামেরাও পেয়েছি বেশ কষ্টে। ক্যামেরা নিয়ে বাজে সব অভিজ্ঞতা আমার। মাঝেমাঝে একেকটা মনে পড়লে বেশ কান্না পেয়ে যায়!
প্রথমটা ছিল ইয়াশিকা মডেলের একটা ক্যামেরা। এমনিতে টুকটাক পারিবারিক ছবি তুলবার জন্য। মোটামুটি ভালই ছিল। তো, শেষবার স্কুল পিকনিকে যাবার সময় বাবাকে বললাম, ফিল্ম নিয়ে আসতে। আনল বেশ, কয়েকটা ছবি বাসাতেই তোলা হল। কোনমতে ফিল্মগুলো বাঁচিয়ে একুরিয়ামের ওপর এক কোণে ক্যামেরাটা রাখলাম, আর ঠাস করে ক্যামেরা কিসের দুঃখে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করিল!
ভেবেছিলাম আত্মহত্যাই। পরে দেখি, ওপরে ফ্ল্যাশের সামনের খাপটা খুলে গেছে। এক কোণাও ভাঙা, নয়ত স্ক্রু দিয়ে লাগানো যেত। এদিকে কাল পিকনিক,এখন কিছু করা যাবে না। অর্ধমৃত ক্যামেরার ওপর অত্যাচার চালানোই ছবি ওঠানোর একমাত্র উপায়। সেটা নিয়েই গেলাম। বেশ মজা করে ছবি তুললাম। আহা কি আনন্দ! ও খোদা!! যেদিন ওয়াশ করিয়ে এনেছে, দেখি পুরো নেগেটিভ ফাঁকা!! ভূত-পেত্নির ছবি তুললাম নাকি তাহলে! কেঁদে-কেটে অস্থির যাকে বলে!
এরপরের উপলক্ষ ছিল কাজিনের বিয়ে। আমাদের বংশের এই প্রজন্মের প্রথম বিয়ে। ঐ ভূতুড়ে ক্যামেরা দিয়ে হবে না বলে আরেকটা কেনা হল। ভেবেছিলাম ভালই হবে। আবার সেই খেল! ওয়াশ করিয়ে আনবার পর দেখা গেল আলো কম, সবগুলোই আঁধারে ঢাকা! দু একজনকে যা-ও দেখা যাচ্ছে, তাও আবার যেন একেকজন মামদো ভূত। আমার এইসব ভাই-বেরাদরকে মামদো ভূত করে উপস্থাপনার কৃতিত্বটা যে ক্যামেরার এটা তো তাদের বোঝানো যাবে না। তাই সব ছবি ব্যর্থ প্রেমিকের মত রান্নাঘরে চুলার আগুনে পতন এবং দহন।
আর সবশেষটা দিন কয়েক আগে কেনা হয়েছে গ্রামে যাওয়া উপলক্ষে। মোটামুটি জোরাজুরি করেই। ক্যানন IXUS 95 IS মডেলের। গ্রামে গিয়ে শহুরে দেহ-মন অন্যদের যেরকম প্রাণরসে ভরপুর হয়ে ওঠে, আমার সেটা হয় না। আগাগোড়াই শহুরে আমি। তবে এবার বেশিরভাগ সময়েই কেটেছে বাইরে বাইরে। ধানক্ষেত কিন্তু পুকুরে হাঁস এসবের প্রতি আমার সদ্য জেগে ওঠা আগ্রহ দেখে সবাই হেসে খুন! সবাই মানে আমার গ্রামীণ ভাই-বোনেরা। তবুও তারা ছিল বলেই ভয় কাটিয়ে মাঝরাতে জ্যোৎস্না মাখা পথ ধরে হেঁটে গেছি অনেক দূর, কিংবা যে রোদের প্রতি আমার কিঞ্চিৎ ভয়, সেই রোদের মাঝ দিয়ে ধানক্ষেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছি। সেটা নিয়ে বিস্তারিত পরে এক সময় বলা যাবে। আপাতত কিছু ছবি দেখা যাক।











আপাতত এ ক’টাই দেওয়া যাক এখানে। পুরো এলবাম দেখতে যেতে হবে এখানে।
৭ ডিসেম্বর, ২০০৯
চিরকুট থেকে..ব্যস্ততা
হঠাত হঠাত কোথা থেকে যেন একরাশ ব্যস্ততা এসে ঘিরে ধরে। ১২ পেরনোর পর ব্যস্ততা বেশ কমে গিয়েছিল, সেভাবে খুউউউব মন দিয়ে না পড়ার কারণে। তবুও কিভাবে যেন আগের জায়গাতেই থেকে যেতাম। এখন তাই হঠাত হঠাত এই ব্যস্ততা নামক কৃত্রিম অনুভূতিটাকে দেখলে কিংবা অনুভব করলে বেশ অবাক হই। ভালও লাগে বটে। পৃথিবীর সব ঝামেলা থেকে সরে গিয়ে কোন একটা কাজের মাঝে মন আটকে রাখাটা চমকপ্রদ একটা ব্যাপার!
তবে কিছু কিছু কাজ, যদি সেগুলো আমার খুব পছন্দের হয়, এই ধরা যাক,কোন মস্তিষ্ক আলোড়নকারী তথা ব্রেইনস্ট্রোর্মিং কোন বিষয় নিয়ে এসাইনমেণ্ট লেখা বা কোন কিছুর সংক্ষিপ্তভাব, যেখানে নিজের মত প্রকাশের সুযোগ থাকে, এমন কাজে ব্যস্ত থাকতে আমার বেশ লাগে। মানুষ ব্যস্ত বলতে কি বোঝায় আমি ঠিক জানি না। সম্ভবত বেশি কাজের মাঝে থাকা এরকম কিছুই হবে। আমার কাছে ব্যস্ততার সংজ্ঞা অন্যরকম। আমি যেগুলো করতে ভালবাসি, সেসবের মাঝে যদি মনটাকে অন্তত মিনিট পাঁচেকের জন্যও আটকে রাখতে পারি, সেটাই আমার ব্যস্ততা। অবশ্য ব্যস্ত হতে আমার বেশ বেগ পেতে হয়। মনমত কাজ খুঁজে পাওয়াটাই কঠিন! পেলেও এমন সব কাজ, যেগুলো করতে গিয়ে নিত্যদিনের অনেক অপরিহার্য কর্তব্য একটু অন্যপাশে সরে যায়। তবুও অমন কোন কাজ পেলে বলতে ভালবাসি, “ব্যস্ত!”
ব্যস্ততা শব্দটাকে কখনই একা একা ব্যবহৃত হতে দিইনা। আগেপিছে কিছু না কিছু একটা থাকেই। এই যেমন, একটু ব্যস্ত অথবা ব্যস্ত একটু। বেশি শব্দটার ব্যবহার প্রায় হয়না বললেই চলে। তবুও ওই সামান্য ব্যস্ততাটাই আমার বেশ ভাল লাগে। ধুলো পড়া মনে খানিকটা ঝাড় পড়ে, দিনকয়েকের জন্য আশেপাশের সব তিক্ততাকে ভুলে থাকতে পারি। আর ব্যস্ততা পরবর্তী কাজটা সম্পন্ন করবার আত্মতৃপ্তি তো প্রায় স্বর্গীয় একটা অনুভূতি।
আজ কি নিয়ে ব্যস্ত তাহলে? সামাজিক বিজ্ঞানের পাতার পর পাতা সাজানো ইতিহাস আর অর্থনীতি নিয়েই আজ আমার দিনভর ব্যস্ততা। সাথে জানালার ওপাশে কুয়াশা। বেলা পড়ে এলো প্রায়, তবুও ভোরের কুয়াশাগুলোর বাড়ি ফিরবার নাম নেই। ভারি অবাধ্য হয়েছে আজকাল। যাক তবে ভালই হল। কুয়াশার প্রতি আমার অদ্ভুত রকমের ভালবাসা গড়ে উঠেছে। সম্ভবত আমার সামনের দিনগুলোর অনিশ্চয়তার সাথে কুয়াশার স্থায়িত্বের মিল খুঁজে পাই বলেই এমনটা হয়েছে! তবে থাকুক আজ দিন আমার কুয়াশা আর পুরনো দিনের মহিষীদের সাথে! দুয়ারের অন্য পাশে কে দাঁড়িয়ে আছে, তা জানাটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে আজকাল…
২৪ নভেম্বর, ২০০৯
দারিদ্র্য সংক্রান্ত ভাবনা ও কাহিনী অন্যান্য।
নিশ্চিত নই যে, আজকাল কি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আসলেই বেড়েছে, নাকি আগের মতই আছে। আমি বাইরে বেরোই বেশ কম। আগে যেরকম রোজই কোথাও না কোথাও যাওয়া হত, এখন তা হয়না। তারপরেও কোন না কোন কারণে যখন বেরোই, তখন রাস্তার আশেপাশের দরিদ্র মানুষদের দিকেই চোখ আটকে যায়। এক রকম বিস্ময় নিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ করতে থাকি। বেশিরভাগ দেখা যায় তো হাইরাইজ বিল্ডিংগুলোর আশেপাশে, কিংবা শপিং কমপ্লেক্সগুলোর সামনে, আর ট্রাফিক সিগন্যালের কথা তো বাদই দিলাম। একদিকে আলো ঝলমলে শান-শওকতে পূর্ণ আলোকজ্জ্বল কমপ্লেক্সগুলো, এলিভেটরের ওপর পুতুলের ন্যায় সজ্জিত মানুষ, চোখে মুখে কিছু বিলাসিতার দ্রব্য পাবার তৃপ্তি; অন্যদিকে আলোর সামনে অন্ধকার, ছিন্ন বসনের কিছু মানুষ, রুক্ষ মুখ, সামনে এগিয়ে দেয়া শূন্য হাত, কণ্ঠে অসহায় আকুতি সামান্য কিছু অর্থের জন্য। দেখি আর অবাক হই। এদের মাঝে পার্থক্য কিসে? দুই শ্রেণীর মধ্যে বিভেদ শুধু অর্থ-সম্পদ, সামর্থ্য আর জন্মে। প্রথম শ্রেণীর মানুষটার ভাগ্যক্রমে জন্ম হয়েছে সামর্থ্যবান মানুষের ঘরে, যার কারণে ঐ এলিভেটরে তার পা পড়েছে; আর দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষটার জন্ম হয়েছে জীর্ণ ফুটো চালের নিচে, ঐ চালের নিচে বসবাসকারী মানুষদের আর্থিক দুরবস্থার জন্য তার হাতটা প্রথম শ্রেণীর মানুষদের সামনে পাতা। তবে শুধু কি জন্মই এই বিভেদের কারণ?
একবার অনেকদিন বাদে নিউমার্কেটে গিয়েছিলাম কিছু বইপত্র কিনতে। সেবারকার অভিজ্ঞতাটা সম্ভবত অনেকদিন মনে থাকবে। প্রথমবারের মত, এসব দরিদ্র মানুষদের জন্য বেশ কিছুদিন মনটা বিষণ্ন হয়ে ছিল। ফুডশপের সামনের মেঝেতে গড়ানো ছেলেটা, কিংবা নীলক্ষেত সিগন্যালের রোড-আইল্যাণ্ডে বসে থাকা বাচ্চাগুলো কি কারণে যেন আমার মনে খানিকটা অপরাধবোধ জন্মে দিয়েছিল। হাতে ধরা প্রিয় বইগুলোর দিকে একেকটা অপরাধবোধের তীর ছুঁড়ে দিয়ে মনে প্রতিধ্বনি তুলছিল, “এই বইগুলো পড়ে তুমি হয়ত কিছু শব্দ শিখবে, কিছু আনন্দ পাবে, কিছুটা সময় কাটাবে। কিন্তু ঐ যে, ঐ বাচ্চাটাকে দেখো। ও তো এই বইয়ের সমপরিমাণ অর্থ পেলে কিছু খেতে পেত। তুমি যা জান, তা কি আপাতত যথেষ্ট নয়? তুমি তার জায়গায় হলে কি করতে? সাড়ে পাঁচশ টাকা হাতে, পেটে কিছু পড়েনি, এমন হলে কি করতে? বই কিনতে? নাকি কিছু খাবার কিনতে? “ আমি নিরুত্তর। এটার কোন উত্তর হয়না।
বাসায় এসে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম এ প্রসঙ্গে। মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলাম। কেউ বলেছিলেন, এরকম যেন সবসময় মাটির কাছাকাছি থাকি; কেউ বলেছিলেন, এটা হয়েছে আমার মন নাকি খুব নরম(!) তাই; কেউ বলেছিলেন, এই ভাবনাটা ভুল, কেননা, সে এই টাকাটা পেলে কিছুদিন ভালভাবে খেত, পরত, তারপর আবার গরিব হয়ে যেত। শুনলাম, দেখলাম, ভাবলাম। কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। শেষ যুক্তিটা আমার কাছে প্রথমে মনে হয়েছিল একেবারেই অগ্রহণযোগ্য, পরবর্তীতে বিভিন্ন দিক ভেবেচিন্তে মনে হল, না, অতটা অগ্রহণযোগ্য নয়।
কিছুটা ব্যাখ্যা করা যাক। ধরা যাক, আমি এক “শারীরিকভাবে অক্ষম” দরিদ্র লোককে এক মাসের জন্য পাঁচশ টাকা দিলাম। যেহেতু সে অক্ষম, সে কাজ করতে পারবে না। তাই তার কাজ করে খাওয়াও সম্ভব হবে না। সে হয়ত এই টাকাটা তার পরিবারের কাউকে দেবে। সে কি করতে পারে? প্রথম দিন কিছু কিনে খাবে, কিছু পোশাক কিনবে। নিজের প্রয়োজন মেটাবে। কিন্তু? কি করলে পরবর্তীতে তাকে চেয়ে খেতে হবে না, এই কাজটা সে করবে না!!
অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাক এবার। টাকাটা “শারীরিকভাবে সক্ষম” কাউকে দিলাম। এটা ব্যাখ্যার কোন প্রয়োজন আছে!? সক্ষম হলে সে তো কাজ করেই খেতে পারবে! চেয়ে খাবার কি দরকার!!
আম্মু প্রায়ই বলে একটা কথা, যেটা সবসময় মানার চেষ্টা করি। কাউকে সাহায্য দিতে হলে দেবে, খেয়াল কোরো, সে যেন সক্ষম কেউ না হয়। সাহায্য দেবার কথা আমাদের ধর্মে বলেছে বটে, কিন্তু শারীরিকভাবে সক্ষম কাউকে দেওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন এটা যে, অক্ষম কাউকেই ধরো দিলাম, কিন্তু সে যদি সেটার যথার্থ ব্যবহার না করে? আমার মতে, এটার কোন উত্তর হয়না। কেননা, এটা নির্ভর করবে, যাকে দেয়া হচ্ছে, তার মন-মানসিকতার ওপর।
একদিক দিয়ে আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, এটা আসলে এদেশের মানুষের মানসিক দৈন্য। কাউকে দেয়া হলে সে টাকাটা দিয়ে এমন কিছু ব্যবস্থা করতে পারত, যাতে তাকে আর চেয়ে খেতে না হয়; কিন্তু সে তো করবে না এটা। টাকাটা পেয়েই বর্তে যাবে! নিজের সাধ মেটাবে, দিন কয়েক পরে আবার গরিব হয়ে যাবে! এখানে তো তার মানসিক দৈন্যটাই প্রকট। যেমন ধরা যাক, আমরা যে মাঝেমাঝে বলি, রিকশাওয়ালাদের দুই-পাঁচ টাকা বাড়িয়ে দিতে পক্ষান্তরে সম্ভবত সেটা সঠিক করি না। রিকশাওয়ালাদের কি আমরা দেখি না, রিকশা টানতে টানতে সিগারেট খেতে? এই টাকাটা কোথা থেকে আসে? আমাদের এই বাড়িয়ে দেয়া দুই-পাঁচ টাকা থেকেই। এই টাকাটা সে জমাচ্ছে না, তার ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করছে না। তার ভাগ্য কিংবা ভবিষ্যতটাকে আমরা নিজের হাতেই ধ্বংস করছি। যে করুণ চোখের শিশুটির শূন্য হাতে আমরা পয়সা ফেলে দিই, আমরা কি জানি, সেই শিশুটিই সেই শূন্য হাতেই তার ভাইদের সাথে পলিথিনে রবারের আঠা ঢুকিয়ে নেশায় মেতে উঠছে না? এর টাকাটা কোথা থেকে আসছে? আমাদের এই সাহায্য(!) থেকে। তার নিজস্ব মানসিক দৈন্য কিংবা অদূরদর্শিতার কারণে আমাদের প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হয়ে যায়।
তবে? কি করব? সাহায্য দেওয়া বন্ধ করে দেব? সম্ভবত এটাই আপাতত উপায়। অন্য কোন উপায় কারও জানা থাকলে জানিয়ে দেবেন দয়া করে। আরেকটা হয়ত হতে পারে এদের এই মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো। প্রায় অসম্ভব একটা কাজ। ভিক্ষা করে কোটিপতি হবার দু একটা প্রায় দুর্লভ খবর পত্রিকায় যে উঠে আসে, এটাই তাদের স্বপ্ন দেখায়।
তবুও একেবারে দরিদ্র মানুষ, যাদের এই দৈন্যটা নেই, তারাও আছে বটে। তাদের জন্য সাহায্যের হাতটা এগিয়ে দেয়া যায়। পত্র-পত্রিকার পাতায় প্রায়শ এরকম সংবাদ আসে। ভাল লাগে পড়লে। কিছুদিন আগে, সম্ভবত ১৭ তারিখ, এক রিকশাওয়ালাকে দেখলাম। এক পায়ের গোড়ালি বাঁকা, অনেকটা মুড়নো, রিকশা চালাচ্ছে। তার এই উদ্যম দেখে ভাল লাগল। চাইলে সেও এক হাতে লাঠি ধরে সাহায্য চেয়ে বেড়াতে পারত। দিনে বিনা পরিশ্রমে সাহায্য চেয়ে ১০০ টাকা আয় করলেও মাসে আয় হত তার ৩০০০ টাকা। অন্যদিকে পরিশ্রম করে এখন সে আয় করছে। অর্থটা মুখ্য নয়, নিজের সম্মানটা বিসর্জন দিচ্ছে না। তার মানসিক এই দৃঢ়তা দেখে ভাল লাগল খুব। তাকে কিছু টাকা বাড়িয়ে দিতে আপত্তি নেই তাই।
আসলে এই মানুষগুলো আর্থিকভাবে দরিদ্র নয়, তারা মানসিকভাবে দরিদ্র। তাদের এই মানসিক দৈন্যটা দূর করাই সম্ভবত তাদের আর্থিক দুরবস্থাটা দূর করবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের কি করণীয়? জানতে চাই তোমাদের কাছে।
৯ নভেম্বর, ২০০৯
~~“আমার কথাটি ফুরলো, নটে গাছটি মুরলো।“~~
~~“আমার কথাটি ফুরলো, নটে গাছটি মুরলো।“~~
অন্দরমহলের রূপকথার সাময়িক একটা সমাপ্তি টানলাম। প্রিয় জিনিসগুলোর ওপর বাজি ধরতে কেন যেন খুব ভাল লাগে। লেখাগুলোর প্রতি সবসময়ই বেশ উদাসীনতা কাজ করেছে, কিন্তু সময়ে সময়ে বেশ অনুভব করেছি, লেখাগুলোর প্রতি অদ্ভুত এক ভালবাসা জন্মে গেছে। এই ভালবাসা একরকম দুর্বলতাও বটে। দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে লেখালেখি থেকে অন্তত দু’মাসের বিরতি নিতে চাই এবার। রূপকথার রাজকুমারী এবার রাজ্যে মন দেবে। সফলতার আশা ক্ষীণ, তবুও রাজ্যে মন দেবে। রূপকথাগুলো জমে থাকুক। ফিরে এসে শোনানো যাবে। আর এতদিন ধরে রূপকথা শুনিয়ে যাচ্ছি…একটু প্রার্থনা করবে আমার জন্য? দীর্ঘদিনের অপ্রাপ্তিগুলোকে নির্বাপিত করে আলো জ্বালতে চাই..স্বপ্নের আলো, আশার আলো, আর একরত্তি….
থাক!
এতে সদস্যতা:
পোস্টস (Atom)



.jpg)
